৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বার্তাটি লিখেছেন: আশফাকুর রহমান

আমার সম্পর্কে : বার্তা বিভাগ প্রধান
প্রচ্ছদ বিভাগ যুবদের কথা

আইন নাকি মানসিকতা কোনটিতে সুরক্ষিত হবে ভোক্তা অধিকারঃ আয়েশা সিদ্দিকা লোপা

যদি গোড়া থেকে দেখি তবে দেখতে পাই যে ১৯৩০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট মহামন্দায় জনজীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ-দুর্দশা। এ সময় থেকেই মানহীন পণ্যের ছড়াছড়ি ও নিত্য পণ্যের মূল্যের উর্ধ্বগতির সংস্কৃতি Corporate Sector এ শুরু হয়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টার মাঝে ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো বেসরকারিভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ইউনিয়ন গড়ে ওঠে।

ইউনিয়নের নিজস্ব প্রচেষ্টায় খাদ্য পণ্য পরীক্ষাগার গড়ে তোলা হয়। এ পরীক্ষাগারে ক্ষতিকর ও ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে নিজস্ব প্রকাশনা ‘Consumers Report’-এ প্রতিবেদন প্রকাশ করতো। মার্কিন মুল্লুকে সূচিত ভোক্তা আন্দোলন ইউরোপ হয়ে পর্যায়ক্রমে এশিয়া-আফ্রিকাসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহের বাজার জাতকরণ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে ভোক্তা সাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই ছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশেও ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ ও তাদের অধিকার রক্ষায় ২০০৯ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন। এ আইনের ফলে কোনো ভোক্তা পণ্য ক্রয়ে পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, মূল্যসহ কোনো বিষয়ে প্রতারিত হলে তার প্রতিকার পেয়ে থাকেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সম্পর্কে অবগত নয়। এমনকি শিক্ষিত সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যেও এই আইন সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই।

এই আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকার দরুণ প্রতারিত হওয়ার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে ভোক্তা অধিকারকে নাগরিকদের সাধারণ দেওয়ানি অধিকার হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। উন্নত বিশ্বে ‘ভোক্তা অধিকার’ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।

Actually, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বহুদিন থেকেই এ ধরনের আইন বাস্তবায়নের সুফল পেয়ে আসছে। নাগরিকদের ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য রাষ্ট্র বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়ে থাকেন। একটি কার্যকর ভোক্তা আইনের ফলে সেসব দেশে জনস্বার্থ তথা ভোক্তা অধিকার আজ একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়।

একজন ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য ক্রয় করেন, তখন তার জানার অধিকার রয়েছে যে  পণ্যটির Manufacturing বা Expire date কবে আর কতদিন, ইহা কোথায় উৎপাদিত হয়েছে এবং ইহার কাঁচামাল কী কী, মূল্য কত ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে একজন বিক্রেতা বাধ্য। যদি কোনো বিক্রেতা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেন বা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন আইন অনুযায়ী তাতে ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। কিন্তু এ নিয়ে নাগরিকরা কোনো প্রতিবাদ করেন না। অথচ অন্যান্য দেশে ভোক্তা অধিকার লংঘনের কথা ভাবাও যায় না। ভোক্তা অধিকার লংঘন করলে অনেক দেশে বিক্রেতার লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল করা হয়। শুধু তাই নয়, আছে ফৌজদারি দণ্ডও।

যেকোনো দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের প্রথম পদক্ষেপই হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু আমাদের মাঝে অর্থাৎ ভোক্তাদের মাঝেই সে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। ফলে, ভোক্তারা পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে। মিথ্যাচার, ভেজাল, ফর্মালিন আজ ভোগ্যপণ্যের সাথে মিশে গেছে। এমনকি ওষুধ দিয়ে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। মুরগীকে খাওয়ানো হচ্ছে বিষাক্ত আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম। বাজারের শাক-সবজি, ফল-মূল সব কিছুতেই  ইথিলিন, ফরমালিন আর কার্বাইড। নির্ভেজাল কিছু যেন চোখেই পড়ে না।

আইন প্রণয়নের পর বিভাগ, জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় বাজার মনিটরিং ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে এ আইন বাস্তবায়ন কার্যক্রম যেভাবে এগিয়ে চলছে তা Undoubtedly Praiseworthy. এ লক্ষ্যে মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে অভিযান পরিচালনার সংবাদ দেখা যায়। এটিকে আংশিকভাবে এ আইন বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু জনগণের দোড়গোড়ায় এ আইনকে পৌছে দিলেও ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হতে হবে সবাইকে।

যদিও অতি ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও জনগণ এর সুফল কিছুটা পেতে শুরু করেছে। আমাদের সরকার আইন প্রণয়ন করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নামে একটি অধিদপ্তর সৃষ্টি করেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে এ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৭টি বিভাগীয় কার্যালয় ও ৯টি জেলায় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সবকটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তবে, পুরোপুরি এর বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে তৃণমূল ভোক্তাদের স্বার্থ এখনো পরাভূত। আসলে ভোক্তা অধিকার বলতে যে একটি বিষয় আছে সেটিই আমাদের মাঝে নেই। প্রতারণা যেনো আমাদের নিত্যসঙ্গী। খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ভেজাল থাকবে এটি আমাদের দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতারক চক্রের কাছে। সেই সাথে ওজন ও মানের তো কোনো বালাই নেই। পয়সা  গুনেও অনেক সময় আসল ও ভেজালবিহীন পণ্য পাওয়া যাবে না।

আবার বর্তমানে Virtual কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু Website এ পণ্যের যে মান বা ছবি উল্লেখ থাকে, মূল্য পরিশোধের পর পণ্য হাতে পেয়ে দেখা যায়- বর্ণিত গুণাগুণ সেই পণ্যের মধ্যে নেই বা উল্লেখিত পণ্যের সাথে কোনো মিলই নেই। এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু শাস্তিতো অনেক পরের কথা এনিয়ে প্রতারকদের সাথে কথা বলাও অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।

মূলত জনগণের পক্ষ থেকেই এর বাস্তবায়নের জন্য তেমন ইতিবাচক সারা নেই। অবশ্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে কিছু ধরপাকর ও জরিমানা কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়। এর বাইরে ব্যাপকহারে জনগণের মাঝে তেমন কোনো সাড়া নেই। অতএব এর সুফল পেতে হলে জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে।

২০০৯ সালের এ আইনটি হওয়ার আগে কমবেশি ৪০ টি আইন ও ধারা বিচ্ছিন্নভাবে ভোক্তা অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। ২০০৯ সালের আইনের মাধ্যমে সবগুলো প্রাসঙ্গিক বিষয় একসাথে করা হয়। ভোক্তা অধিকার নিয়ে আরো যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আইন আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বিএসটিআই অধ্যাদেশ ১৯৮৫, অত্যাবশ্যক পণ্যসামগ্রী আইন ১৯৫৬, নিরাপদ খাদ্য আইন ১৯৫৯, পণ্য বিক্রয় আইন ১৯৩০, ওজন ও পরিমাপ আইন ১৯৮২ ও এক্রেডিটেশন বোর্ড আইন ২০০৬। সবগুলো আইনেই ভোক্তা অধিকারের কথা বলা আছে।

তবে ২০০৯ সালের আইনের একটি সমস্যা হলো এখানে ভোক্তাদের অধিকারগুলো কি কি তা বর্ণনা করা হয়নি। তবে অধিকার লংঘন হলে ভোক্তা বা কর্তৃপক্ষের করণীয় কি এ বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে যথাযথভাবে। তবে আইনটিতে ভোক্তা অধিকারগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হতো।

এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ভারতের কথা। ভারতে কর্তৃপক্ষ ভোক্তা অধিকার লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। এটি উপ-আইনগত ব্যবস্থা-Quasi-Judicial Step। ১৯৯৬ সালের আইনানুযায়ী সে অধিকার দেওয়া হয়েছে। সেখানে জাতীয়, রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে তিনস্তর বিশিষ্ট আইনী পদক্ষেপ নেওয়ারই বিধান আছে।

তবে যাই বলি না কেন অধিকার সুরক্ষায় কিন্তু প্রথমে নিজেদেরই সচেতন হতে হবে। কিন্তু কিভাবে সচেতন হতে পারি আমরা?আমি বলছি কিভাবে। বাণিজ্যিক আইনে ক্রেতা সাবধান নীতি (Doctrine of Caveat Emptor) নামে একটি বিষয় রয়েছে। ইহা আবার কি নীতি তাইতো?

In fact, এই নীতি বলতে এমন এক নিয়ম নীতিকে বুঝায় যেখানে কোনো কিছু ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাকেই সাবধানতা অবলম্বনের তাগিদ দেয়া হয়। এই নীতির মুল কথা হল ক্রেতা কোনো কিছু ক্রয় করার পূর্বে ভালোভাবে যাচাই বাচাই করে তথা পণ্যের গুণগত মান যাচাই করে ক্রয় করা উচিত। যদি ক্রয় করার সময় যাচাই করা না হয় তাহলে পরবর্তীতে কোনো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

ক্রেতা সাবধান নীতি অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় যে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই সমান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কেউই কারো অপেক্ষা হীন নয়। সুতরাং বিক্রেতা কোনো তথ্য সম্পর্কে নীরব থাকলে সে ক্ষেত্রে ক্রেতার কর্তব্য হল বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার সর্বাত্নক চেষ্টা করা।

আইনের এই নীতিটিকে আমি মন থেকে শ্রদ্ধা জানাই। কারণ কেন জানেন? ক্রেতা বা বিক্রেতা যেই হোক না কেন ভালো মন্দ যাচাই বাচাই করার দায়িত্ব কিন্তু তার তার নিজস্ব ব্যাপার। ভালো হলেও তা কাউকে অবগত করার দায়িত্ব নিজের আবার মন্দ হলেও নিজের। আমি মনে করি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করার জন্য যত আইনই থাকুক না কেন আসলে কেবল রাষ্ট্রের একার পক্ষে আইন প্রণয়ন করে অপরাধ সম্পূর্ণরূপে নির্মুল করা সম্ভব নয়। যেমন ধরুণঃ দেশে ধর্ষণ, হত্যা, লুন্ঠন, দুর্নীতি এগুলোর জন্য রাষ্ট্র কি আমাদের আইন বা সাজা সম্পর্কে অবগত করেন নি? কিন্তু পারছি কি আমরা এসব দমন করতে? না। কারণ যে কোনো অপরাধ দমনের জন্য সর্বপ্রথম যেটা দরকার তা হলো অপরাধীর বা অপরাধ করতে প্রস্তুত এমন মানুষের  মানসিকতার পরিবর্তন। অপরাধ যে করেছে বা করবে তার নিজেকেই আগে অপরাধ না করার জন্য মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যেমনঃ কোনো খাবারে কেউ যদি ভেজাল মিশ্রিত করতে চান বা কেউ খারাপ পণ্য ভালো বলে বিক্রয় করতে চান তবে তার নিজেকেই আগে বুঝ দিতে হবে যে এটা অপরাধ। এটা করা যাবে না। মোদ্দা কথা যদি নিজস্ব মানসিকতার পরিবর্তন করা যায় তবে দেখবেন ৫০% অপরাধ কমে যাবে। সুরক্ষিত হবে মানব জীবন। ভাবছেন বাকি ৫০% অপরাধের কি হবে? তার জন্য তো আইন রয়েছেই।

লেখিকা – আয়েশা সিদ্দিকা লোপা
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

 

Leave a comment