অনলাইন ডেস্ক: ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ এবং দেশের বাইরে ব্যাপক বিতর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভোট নিজে দিতে না পারার অভিযোগ অসংখ্য মানুষের। এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এর জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে সারাদেশে গণভোটের ব্যালট পেপার পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি।
সর্বশেষ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর একই বছরের ২১ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেয় সরকার। তারপর থেকে ইসি বারবার বলছে, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে যা যা করণীয় তা করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবারও (৮ জানুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘দেশে কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না। এবং রাজপথে নামারও দরকার হবে না। আমরা ইনসাফে বিশ্বাসী। আমরা ইনসাফ করব।’ এমন প্রেক্ষাপটে সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণভোটের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে সিইসিসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনাররা ভোটকে সুষ্ঠু ও অবাধ করতে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
জেলা পর্যায়ে পাঠানো এই ব্যালটগুলো কড়া নিরাপত্তায় রিটার্নিং অফিসারদের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, পোস্টাল ব্যালটগুলো নিবন্ধনকারীদের স্ব স্ব ঠিকানায় পৌঁছে দিচ্ছে ইসি। তবে, জাতীয় সংসদের ব্যালট মুদ্রুণ শুরু হবে চূড়ান্ত প্রার্থী ও প্রতীক বরাদ্দের পর। ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইসির নির্বাচনি শাখার কর্মকর্তারা জানান, কুমিল্লা অঞ্চল দিয়ে প্রথম গণভোটের ব্যালট পাঠানো শুরু হয়। এরপর রাজশাহী ও রংপুর আঞ্চলে পাঠানো হয়। পর্যায়ক্রমে ঢাকাসহ সারাদেশে পাঠানো হবে। সরকারি তিনটি প্রিন্টিং প্রেসে (গর্ভমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস, বিজি প্রেস ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস) এগুলো মুদ্রুণ হচ্ছে। আগামী ২০ জানুয়ারি মধ্যে সব ধরণের নির্বাচনি মালামাল সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পৌঁছাবে।
তবে আগাম গণভোটের ব্যালট পাঠানোর কারণে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত। সেজন্য, ইসিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ব্যালট পেপার ট্রেজারি বা স্ট্রং রুমে সশস্ত্র পাহারা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
২০১৮ সালের রাতের ভোট উপহার দেওয়া একজন নির্বাচন কমিশনার আলাপকালে এ প্রতিবেদককে নাম প্রকাশ না করে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বলেন, গণভোটের ব্যালট পাঠাচ্ছে, ভালো কথা। কাজ এগিয়ে থাকল। কিন্তু, সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি না হয়। সেজন্য সরকারকে বেশি উদ্যোগী হতে হবে। সামগ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। আমাদের সময় কিন্তু সরকার যথাযথ সহযোগিতা ইসিকে করেনি। যে কারণে আমাদের কলঙ্কিত হতে হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ব্যালট পেপার আগে পাঠানো প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক হলেও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। রিটার্নিং অফিসারদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারার ব্যাপক অভিযোগ ওঠে, যা দেশ-বিদেশে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। টিআইবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনে নির্বাচনি অনিয়মের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে, যা দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর জনমনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছিল।
নির্বাচন পরিচালনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, ব্যালটের প্রতিটি পর্যায়ে ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং সিসিটিভি নজরদারির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
ইসির দাবি, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হতে যাচ্ছে, যেখানে একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। কথাগুলো সিইসি, একাধিক নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন।
ইসি সচিবালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানায়, গণভোট ও পোস্টাল ব্যালটের পাশাপাশি নির্বাচনি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ৩৬ ধরণের মালামাল সংগ্রহের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই মালামাল পৌঁছে যাবে।
এ তালিকায় রয়েছে: ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার (গণভোটের জন্য আলাদা), অমোচনীয় কালি, ভোটার তালিকা। স্টেশনারি ও সুরক্ষা সংক্রান্ত মালামালের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের সিল (এ্যারো মার্ক, অফিস সিল), গালা, স্ট্যাম্প প্যাড, সুঁই-সুতা, মোমবাতি, দিয়াশলাই, ক্যালকুলেটর। আর ফরম ও প্যাকেটের মধ্যে ফলাফল বিবারণী ফরম, প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরি, ব্যালট পেপার হিসাব ফরম এবং প্রায় ২০ ধরণের খাম বা প্যাকেট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপারগুলো প্রতীক বরাদ্দের পর পাঠানো হবে। অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ছাপানো ও বিতরণের কাজ শুরু হবে।
এবার দেশে ও দেশের বাইরে থেকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, প্রবাসীদের কাছে পৌঁছানোই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যাতে তারা সময়মতো ভোট দিয়ে ফেরত পাঠাতে পারেন। প্রতীক বরাদ্দের আগেই ভোট দিলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনি এজেন্ট ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগ, তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, নির্বাচনি ব্যয় বিবরণী দাখিল এবং সন্ত্রাস ও জাল ভোট রোধে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। ইতোমধ্যে সব রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন এ সংক্রান্ত এক পরিপত্র জারি করে এমন নির্দেশনা দেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক আয়োজন করতে হবে। বৈঠকে প্রার্থী, তাঁদের নির্বাচনি এজেন্ট ও পোলিং এজেন্টদের সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা–২০২৫ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ–১৯৭২ অনুযায়ী দায়িত্ব-কর্তব্য, নির্বাচনি ব্যয়ের বিধান ও আইন মেনে চলার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
নির্বাচনি এজেন্ট ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগের বিষয়ে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, প্রার্থী নিজ নির্বাচনি এলাকার যোগ্য ভোটারকে নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। প্রয়োজনে এজেন্ট পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। এজেন্ট নিয়োগ না করলে প্রার্থী নিজেই নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে গণ্য হবেন। প্রতিটি ভোটকক্ষের জন্য একজন করে পোলিং এজেন্ট নিয়োগের সুযোগ থাকবে। ভোটগ্রহণের আগে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে নিয়োগপত্র দেখাতে হবে। পোস্টাল ব্যালট গণনার সময়ও প্রার্থী বা তার এজেন্ট উপস্থিত থাকতে পারবেন।
ভোটগ্রহণ ও গণনায় এজেন্টদের ভূমিকা
ভোটগ্রহণ শুরু থেকে গণনা শেষ পর্যন্ত এজেন্টদের উপস্থিতি ও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ভোট গণনার পর প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোটের হিসাব সংবলিত প্রত্যয়িত অনুলিপি এজেন্টদের দেবেন। কেউ স্বাক্ষর বা রসিদ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তা লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ফলাফল একত্রীকরণের সময়ও প্রার্থী ও নির্বাচনি এজেন্টদের উপস্থিত থাকার সুযোগ থাকবে।
ব্যয় বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক
ইসি জানিয়েছে, সব প্রার্থী—বিজয়ী, পরাজিত ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদেরও—নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করতে হবে। নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস, সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হবে।
ফলাফল গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনি ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ রিটার্ন ও হলফনামা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে এবং এর অনুলিপি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়েও পাঠাতে হবে। ব্যয় না হলেও শূন্য ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যয়ের নির্ধারিত উৎসের বাইরে অর্থ খরচ, সীমা অতিক্রম বা ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব অপরাধে সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
সন্ত্রাস ও জাল ভোট রোধে সহযোগিতার আহ্বান
নির্বাচনে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ, ভীতি প্রদর্শন, বল প্রয়োগ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার এবং জাল ভোট প্রদান রোধে প্রার্থী ও এজেন্টদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছে ইসি। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে অবৈধ প্রচার, বিশৃঙ্খলা বা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, আজ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত চলবে আপিল আবেদন গ্রহণ। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

প্রতিনিধি