৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বার্তাটি লিখেছেন: আশফাকুর রহমান

আমার সম্পর্কে : বার্তা বিভাগ প্রধান
প্রচ্ছদ বিভাগ খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ফাইনাল কেন জিতবে ফ্রান্স

ডেস্ক নিউজ:  মানুষটি স্বল্পভাষী, প্রয়োজন ছাড়া নাকি কোনও কথাই বলেন না তিনি। ঠাণ্ডা মাথার, সংযত ও স্বার্থহীন- এক কথায় ভদ্রলোক। সেই মানুষটির হঠাৎ কী হলো, বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল সব। মেজাজ হারিয়ে মাথা দিয়ে গুঁতো মারলেন মার্কো মাতেরাজ্জিকে। ব্যস, বর্ণিল ক্যারিয়ারের গায়ে কলঙ্ক মাখিয়ে পরাজিত এক সৈনিক হয়ে ছাড়লেন মাঠ। ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল যারা দেখেছেন, ফ্রান্সের অবস্থা বোঝাতে তাদের জন্য এটুকু বলাই যথেষ্ট। আর যাদের জানা নেই, তাদের জন্য বলা- জিনেদিন জিদান সেদিন মেজাজ না হারালে ফ্রান্সের ঘরে হয়তো উঠে যেত দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। ইতালির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনালের ১১০ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ফরাসি অধিনায়ক জিদানকে। দলের সেরা খেলোয়াড়কে ছাড়া ফ্রান্স টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হেরে যায় আজ্জুরিদের কাছে। এক যুগ পর আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফরাসিরা। জিদানের লাল কার্ড কিংবা ইতালির বিপক্ষে হারের তিক্ততা মোটেও ভাবাচ্ছে না উজ্জীবিত ‘লে ব্লুজ’কে। তাদের ভাবনায় শুধুই বিশ্বকাপ জয়। ‘তারকার হাট’ ফ্রান্স প্রমাণ করতে চায়, বিশ্ব ফুটবলে শুধু খেলোয়াড় সরবরাহ নয়, জাতীয় দলে তাদের এক সুতোয় বেঁধে ওঠা যায় সাফল্যের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে। বিশ্বকাপের সাফল্য নাকি নির্ভর করে ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামোর ওপর। যে দেশের ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামো যত উন্নত, তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি। ২০১০ সালের স্পেন, ২০১৪ সালের জার্মানি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে এবারের ফ্রান্সকে এই তালিকায় রাখা যাবে না কোনোভাবেই। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনালের একাদশে চোখ রাখুন। ফরাসি লিগে খেলা একটি খেলোয়াড়ও নেই সেখানে। এমনকি বদলি হয়ে যে দুজন নেমেছিলেন, তারাও অন্য লিগের খেলোয়াড়! আসলে ফরাসি ফুটবলাররা এত ভালো খেলছেন যে ইউরোপের অন্য লিগগুলো তাদের দিকে হাত বাড়িয়েই থাকে। ইউরোপিয়ান ফুটবলে এখন সবচেয়ে বেশি তারকা ফুটবলার সরবরাহ করছে সম্ভবত ফ্রান্স। যে কারণে বলা হয়, ফ্রান্স দলে বেঞ্চে যারা বসে থাকেন, তাদের একাদশও অন্য অনেক দেশের সেরা একাদশের চেয়ে ভালো। কিন্তু এত ভালো স্কোয়াড নিয়েও সাফল্য নেই। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর ২০০৬ সালে সম্ভাবনা জাগিয়েও ফাইনালে হারতে হয় জিদানের ফ্রান্সকে। মাঝের দুই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত দল নিয়েও কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যেতে পারেনি। দুই বছর আগে সম্ভাবনা জাগিয়েও জিততে পারেনি ইউরো। ঘরের মাঠে তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড নিয়ে ফাইনালে হেরে যায় পর্তুগালের বিপক্ষে। সময় এসেছে ব্যর্থতার দায় শোধের। শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনা, কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে আর সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে হারিয়ে আসা ফ্রান্স শিরোপার দাবিদারও। কেন? সেই উত্তরই খোঁজা হয়েছে এখানে-

দারুণ ভারসাম্য

রক্ষণ ও ফরোয়ার্ড দুই জায়গাতেই আলো ছড়িয়েছে ফ্রান্স। আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান, কাইলিয়ান এমবাপে, অলিভের জিরু ও উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে সাজানো আক্রমণভাগ বিশ্বের যে কোনও দলে ভয় ছড়াবে। রক্ষণে স্যামুয়েল উমতিতি ও রাফায়েল ভারান বর্তমান ফুটবলের অন্যতম সেরা দুই ডিফেন্ডার। তাদের ঠিক সামনেই থাকা গোলো কাঁতেকে বিবেচনা করা হয় বর্তমানের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। মাঝমাঠে ‘পুনর্জন্ম’ নিয়েছেন পল পগবা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর বেশিরভাগ সময় নিজের ছায়া হয়ে থাকা এই মিডফিল্ডার বিশ্ব মঞ্চে ধরা দিয়েছেন নতুন করে। আর গোলবারের নিচে আছেন বিশ্বস্ত উগো লরি, যিনি গোলমুখে আসা সবশেষ সাত শটের প্রত্যেকটি প্রতিহত করেছেন।

প্রত্যেক পজিশনে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন ফরাসিরা। কোচ দিদিয়ের দেশম একাদশ নির্বাচনেও দিচ্ছেন চতুরতার পরিচয়। সব মিলিয়ে রাশিয়ার ফুটবল মহাযজ্ঞে ফ্রান্স দলে দারুণ ভারসাম্য।

টিম স্পিরিট

‘বিশ্বকাপ প্রতিভাবানকে কদর করে না, করে একটা দলকে’— ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনাল হারের পর বলেছিলেন রবের্তো মার্তিনেস। দলীয় একতায় ফ্রান্সকে জয়ের দাবিদার বোঝাতেই মন্তব্যটা করেছিলেন বেলজিয়ামের স্প্যানিশ কোচ। দলীয় সমন্বয় ও একতা কী, দেশমের ফ্রান্স সেটাই দেখিয়েছে এবারের বিশ্বকাপে।

কীভাবে? প্রথমে ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। দলের প্রত্যেক পজিশনের খেলোয়াড় প্রয়োজনের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে নিশ্চিত করেছেন জয়। নকআউট রাউন্ডে স্কোরশিটের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে বিষয়টি। ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, ফরোয়ার্ড- প্রত্যেক পজিশন থেকে গোল পেয়েছে ফ্রান্স।

এবার তাকানো যাক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। ফ্রান্স ফুটবলে এই জায়গাটা বরাবরই নড়বড়ে ছিল। একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কথা বলে মুখে ফেনা তোলা হলেও দলে সেটার অভাব সব সময়ই ছিল। রাশিয়া বিশ্বকাপে দেশম এই ফাঁকটা বন্ধ করেছেন ভালোবাসা দিয়ে। গোল উদযাপনের সঙ্গে কিংবা বদলি হওয়ার মুহূর্তে প্রত্যেকের একে অন্যকে সম্মান জানানোর দৃশ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। তৃতীয় পছন্দের গোলরক্ষক থেকে নিরাপত্তা কর্মী, শুরুর একাদশে থাকা খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সহকারী কোচ- প্রত্যেকে শতভাগ দিয়েছেন নিজের জায়গা থেকে।

‘একতাই বল’ প্রবাদ মেনে চলা ফ্রান্সের সামনে সব বাধাই উড়ে যাওয়ার কথা।

রক্ষণভাগের শক্তি

২০১৮ বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচনা হয়েছে ফ্রান্স দলের আক্রমণভাগ নিয়ে, এখনও হচ্ছে। তবে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে রক্ষণ। উমতিতি ও ভারান রক্ষণ যেমন সামলাচ্ছেন চমৎকারভাবে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে নিশ্চিত করছেন জয়।

ফরাসিদের শক্তিশালী রক্ষণ ভেঙে ‘ওপেন প্লে’তে গোল করতে পেরেছে কেবল আর্জেন্টিনা। নয়তো বাকি গোলগুলো হজম করেছে হয় পেনাল্টি, নয় কর্নার কিক থেকে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে ৩ গোল হজম করলেও কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে কিন্তু একবারের জন্য বল জালে জড়াতে দেয়নি ‘লে ব্লুজ’।

উমতিতি ও ভারান শুধু রক্ষণ সামলাচ্ছেন না, গোলও করছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারানের গোলেই খুলেছিল উরুগুয়ের রক্ষণের তালা। আর বেলজিয়ামের বিপক্ষে উমতিতির গোলেই ফরাসিরা পায় ১-০ ব্যবধানের জয়। রক্ষণ সামলানোর সঙ্গে প্রয়োজনের সময় স্কোরশিটে নাম তুলে ফ্রান্সের ডিফেন্ডাররা রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আজ তাই ক্রোয়েশিয়াকে শুধু গ্রিয়েজমান-এমবাপেকে আটকালে চলবে না, ঠেকাতে হবে দুই ফরাসি ডিফেন্ডারকেও।

সেট পিস

এখনকার ফুটবল নিয়ে গবেষণা চলে খুব। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোচ সাজান তার একাদশ, যেখানে রক্ষণ নিয়ে কাজ করে থাকেন সবচেয়ে বেশি। আর খেলাটি যদি হয় নকআউট পর্বে, তাহলে তো কথাই নেই, গোলের সুযোগ কোনোভাবেই দিতে চায় না কেউ। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ক্রোয়েশিয়া যেটি দেখিয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে, মানে রক্ষণ নির্ভর ফুটবলে প্রতিপক্ষের গোলমুখের তালা খোলার সবচেয়ে ভালো উপায় সেট পিস।

ফ্রান্স যে জায়গায় রীতিমত সফল। উমতিতি ও ভারানের গোল দুটিও কিন্তু সেট পিস থেকে আসা। বাতাসে দারুণ দক্ষ এই দুই ডিফেন্ডারের সঙ্গে আছেন পরীক্ষিত  জিরু ও পগবা। গ্রিয়েজমানের কার্যকরী ফ্রি কিক কিংবা কর্নারের সঙ্গে তাদের দক্ষতা মিলে গেলে বিপদ হতে পারে ক্রোয়েশিয়ার।

 

Leave a comment