২১শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বার্তাটি লিখেছেন: Md Mahfuz ahmed

আমার সম্পর্কে : প্রতিনিধি
প্রচ্ছদ বিভাগ বাংলাদেশ

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শেষ শ্রদ্ধা, বনানী কবরস্থানে আলী যাকেরের দাফন

শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে পৃথিবীর ভ্রমণ শেষ করে অনন্তকালে যাত্রা করেছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। বেলা ১১টায় তাঁকে নেওয়া হয় আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সেখান থেকে বনানীর উদ্দেশে শেষযাত্রা। জানাজা শেষে বিকেলে বনানী কবরস্থানের সবুজ মাটিতে শেষ নিদ্রা হবে তাঁর।

ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুই দিন আগে তাঁর বাবার করোনা শনাক্ত হয়। সংগত কারণে শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধার আয়োজন করা হয়নি। আজ আসরের নামাজের পর বনানী কবরস্থানের মসজিদে জানাজা পড়ানো হবে। তারপর বনানী কবরস্থানে আলী যাকেরকে দাফন করা হবে।

শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন আলী যাকের। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল।

প্রধানমন্ত্রী শোক বার্তায় বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুননেসা ইন্দিরা প্রমুখ।

আলী যাকের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। সে কারণে শেষ শ্রদ্ধার জন্য নেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। করোনা সতর্কতার অবলম্বন করে, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাঁর কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। প্রিয়জন, সহশিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, মফিদুল হক, নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রমুখ। পরিবারের পক্ষে তাঁর মরদেহের পাশে উপস্থিত রয়েছেন তাঁর স্ত্রী সারা যাকের, ছেলে নাট্যাভিনেতা ইরেশ যাকের, মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়া। সারাক্ষণ কফিনের পাশে ছিলেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর। আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শুরুতেই ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ছিল আলী যাকেরের মরদেহ। সেখান থেকে নেওয়া হয় বনানী, তাঁর কর্মস্থল এশিয়াটিকে।

আলী যাকেরের বয়স ছিল ৭৬ বছর। বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন আলী যাকের। গত সপ্তাহে শারীরিক সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। পরে কিছুটা সুস্থ হলে গত শনিবার বাসায় নেওয়া হয়। রোববার আবার ভর্তি করানো হয়। সোমবার কোভিড-১৯ টেস্ট করানো হয়। ফলাফল হাতে পেলে জানা যায়, তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ।

১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামে। আলী যাকের ছিলেন চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর বাবা মোহাম্মদ তাহের ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকরির বদলি সূত্রে অল্প বয়সে কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে কাটান আলী যাকের।

আলী যাকের ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ওই বছরেরই জুন মাসে তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। তখন থেকে নাগরিকই তাঁর ঠিকানা। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্‌সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক আলোচিত মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আলী যাকের। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্রে।টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটক লিখেছেন। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন দীর্ঘদিন। প্রকাশিত হয়েছে বই ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। শখ করে ফটোগ্রাফিও করেন তিনি।

আলী যাকের নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি তিনি। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৮-তে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেতা আলী যাকের। বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি গ্রুপের চেয়ারম্যান তিনি। স্ত্রী স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের, ছেলের বউ মিম রশিদ, নাতনি নেহা ও মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়াকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। সব ছেড়ে আজ সকালে তিনি পাড়ি দেন না-ফেরার দেশে।

Leave a comment