Home » আমাকে আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয়নি, তাই বিদিশার আচল ধরেছি

আমাকে আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয়নি, তাই বিদিশার আচল ধরেছি

অ্যাডভোকেট সুয়েব আহমদ। সিলেটের রাজনীতিতে আবারও আলোচনায় তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিকের হাত ধরে জাপায় যোগদান করেছেন সুয়েব। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীর মাঝে এবং সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

তবে সুয়েব জানান, তাঁকে আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয়নি। তাই তিনি ‘বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধাভরে জাতির জনক মান্যকারী’ বিদিশার হাত ধরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন।

সুয়েব ছিলেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এবং স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ নেতার অত্যন্ত আস্থাভাজন। ছিলেন সিলেট মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি)।

তবে ২০২০ সালের নভেম্বরে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান বা পদ পাওয়ার লক্ষ্যে সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ছেড়ে দেন সুয়েব। দল ছাড়লেও সিলেট-৩ আসনের সাবেক এমপি মরহুম মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের সঙ্গে তাঁর ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর শূন্য এ আসনে নৌকা প্রতীক পান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব। নির্বাচনকালীন প্রচার-প্রচারণার সময় অভিযোগ ওঠে- হাবিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন সুয়েব। এর ফলে সিলেট মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) পদটি হারাতে হয় তাঁকে।

এদিকে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টিতে ‘অপাংক্তেয়’ বিদিশা সিদ্দিকের হাত ধরে সম্প্রতি জাপায় যোগ দিয়েছেন অ্যাডভোটক সুয়েব আহমদ। দায়িত্ব পেয়েছেন ‘জাতীয় পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় সদস্য’ ও ‘সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারী’ হিসেবে।

তবে জাতীয় পার্টির সিলেট জেলার নেতৃবৃন্দ বলছেন- বিদিশা বা অ্যাডভোকেট সুয়েবের দলীয় কোনো কর্মসূচি দেয়ার ক্ষমতা নেই। তারা জাতীয় পার্টির কেউ নন।

জেলা জাপার আহ্বায়ক কুনু মিয়া শনিবার সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে সুয়েব সম্পর্কে এক পর্যায়ে সিলেটী ভাষায় বলেন- ‘তিনিতো হিদল হুটকি। সুয়েব জাতীয় পার্টির কে?’

শনিবার হঠাৎ করে সিলেট সফরে আসেন মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রাক্তন (তালাকপ্রাপ্তা) স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক। গুঞ্জন ওঠে- সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে রাজনীতির নতুন পথে নতুন লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করছেন বিদিশা। এটা তাঁর ‘সাংগঠনিক সফর’ হিসেবে বলা হলেও মূলত তাঁর এই সফর আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিদিশা শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বিমানের একটি ফ্লাইটে করে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে দুপুর ১টার দিকে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন তিনি। পরে সেখানে যোহরের নামাজ আদায় ও কোরআন শরিফ পাঠ করার পর মাজারে শিরণি বিতরণ করেন। এরপর দরগাহ গেইটস্থ একটি হোটেলে বিশ্রাম করেন এবং হোটেলে অবস্থানকালে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতিবিনিময় করেন।

পরে শনিবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে বিমানের ফ্লাইটে করে সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন বিদিশা। সিলেট সফরে বিদিশার সঙ্গে ছিলেন এরিক এরশাদ ঘোষিত দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান কাজী মামুনুর রশীদ।

শাহজালাল মাজার জিয়ারত শেষে সিলেটে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিদিশা। এসময় তিনি বলেন, ‘সিলেটের মানুষ যেভাবে আমাকে রিসিপশন দিয়েছেন, গ্রহণ করেছেন তাতে আমি ভীষণ আবেগাপ্লুত। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সিলেটকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি মনে করতেন। আমিও যাতে এমনটা বলার জায়গায় যেতে পারি সে চেষ্টাই করছি।’

তিনি বলেন, ‘দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আমার এই সফর। আপনারা জানেন, জাতীয় পার্টির অবস্থা এখন ভালো নেই। সরকারের সঙ্গে ভালো সমন্বয়ও নেই। সমন্বয় থাকলে সিলেট-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক আরও ভোট পেতেন এবং এরশাদের লাঙ্গল মার্কা বিজয় লাভ করতো।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদিশা বলেন, ‘আমাকে ঘিরে কোনো উপদল সৃষ্টি হবে না। এরশাদের ছেলে এরিকের ঘোষণা অনুযায়ী আমি মূল জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান।’

এদিকে, বিদিশা সিদ্দিকের সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। জাপা’র স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিদিশা জাতীয় পার্টির কেউ নন। তিনি একটি অভিশাপ। তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে জীবদ্দশায় অনেক জ্বালিয়েছেন। বিদিশার উপর অতীষ্ট হয়ে এরশাদ ২০০৬ সালে তাঁকে তালাক দেন। সেই থেকে জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিদিশার কোনো সম্পর্ক নেই।

শনিবার বাদ জোহর হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার মসজিদে একটি মিলাদ ও দোয়া মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কুনু মিয়া ও সদস্যসচিব উসমান আলী।

তারা বলেন, শাহজালালের মাজার জিয়ারতে যে কেউ আসতে পারে। এতে কোনো বাঁধা নেই। তবে মাজার জিয়ারতের নামে সিলেটে কোনো নোংরা রাজনীতি করেতে দেবেন না জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

জেলা জাপার নেতারা আরও বলেন, আমাদের জানামতে বিদিশা স্যারের (এরশাদের) ঘরের চাকরানি ছিলেন। তিনি স্যারকে ব্ল্যাকমেইল করেছেন। স্যারের টাকা-পয়সা ও সম্পত্তির লোভে ওই মহিলা এসব করেছেন। তিনি যে সন্তানের (এরিকের) কথা বলছেন, আমাদের জানামতে সে সন্তান স্যারের নয়। ডিএনএ টেস্ট করালেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে।

তারা আরও বলেন, জাতীয় পার্টি সিলেটসহ সারাদেশে ঐক্যবদ্ধ। বিদিশা মধ্যখান থেকে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির পায়তারা করছেন। আমরা সিলেট থেকে দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন জানাবো- বিষয়টি শক্তহাতে দমন করার জন্য।

জেলা জাপার সিনিয়র এই দুই নেতা বলেন, এরিক এরশাদ ও তার সমর্থনকারীরা অসুস্থ। একটা অসুস্থ ছেলে (এরিক) কীভাবে একটি বৃহত্তর দল ঘোষণা করতে পারে! বিদিশা বা সুয়েবের দলীয় কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করার ক্ষমতা নেই।

বিদিশাকে কালানাগিনি, কুলাঙ্গার ও কাজের বুয়া উল্লেখ করে তারা বলেন, উনি এসেছেন। আমাদের ব্যানার ব্যবহার করেননি। আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগও নেই তার। শুনলাম অ্যাডভোকেট সুয়েব নাকি সিলেট বিভাগে আমাদের দল পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েছেন। এটি একটি হাস্যকর ব্যাপার।

সার্বিক বিষয় নিয়ে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিলেটভিউ’র কথা হয় অ্যাডভোকেট সুয়েবের সঙ্গে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমাকে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয়নি। কিছু মানুষের আওয়ামী লীগ করার সৌভাগ্য হয় না। আর কিছু মানুষকে আওয়ামী লীগ করতে দেয়া হয় না। আমি দ্বিতীয় দলে।’

তিনি আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের এক নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই নেতা আমাকে গুম করাতে চান। পুলিশ দিয়ে হয়রানি করাতে চান। আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি ৩৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি। কিন্তু কিছু নেতার কারণে আমি দলে মূল্যায়ন পাইনি। আমার দু:খগুলো জননেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা নেই। তাই আমি আওয়ামী লীগ ছেড়েছি। পরবর্তীতে যখন দেখলাম, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সম্মান করেন বিদিশা- তখন তাঁর হাত ধরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলাম।’

জাতীয় পার্টিতে যোগদানের ক্ষেত্রে মূলধারা ছেড়ে, রওশন এরশাদ বা জিএম কাদেরের হাত না ধরে দলটিতে একরকম ‘অপাংক্তেয়’ বিদিশার হাত ধরেই যোগদান কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সুয়েব বলেন, ‘বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আমরা দেখেছি পরিবারকেন্দ্রীক রাজনীতি ও ক্ষমতায় যাওয়া-আসা। সে হিসেবে এরশাদের পরে তাঁর ছেলেই (এরিক) দলের সর্বোচ্চ আসনের দাবিদার। আর ছেলের সূত্র ধরে মায়ের (বিদিশার) দলে ভূমিকা রাখার অধিকার আছে। তাই বিদিশা বা এরিককে মূল জাতীয় পার্টির বাইরে রাখার বা ভাবার অবকাশ নাই।’

সিলেট-৩ আসনের নবনির্বাচিত এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবের ‘বিরোধীতা’ সম্পর্কে সুয়েব বলেন, আমার বাড়ি সিলেট-২ আসনে। সিলেট-৩ নিয়ে আমার তো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। হ্যা, আমি মরহুম এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী আমাকে খুবই স্নেহ করতেন, আমি তাঁকেও প্রাণভরে শ্রদ্ধা করতাম। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। আমি তিন তিনবার মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম। ‘হাবিবের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান’ এটি একটি অপপ্রচার। আমাকে দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে দোষী বানাতে অপকৌশল হিসেবে এই অপ্রচার চালানো হয়েছে।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগ ছাড়া এবং জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান না পাওয়ার বিষয়ে অ্যাডভোকেট সুয়েব বলেন, ‘আমাকে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড থেকে বলা হলো- দলীয় সাংবিধানিক নীতিমালা অনুযায়ী আওয়ামী লীগে স্থান পেতে হলে সহযোগী সংগঠনের পদ ছাড়তে হবে। আমিও সেই নির্দেশনা মেনে ২০২০ সালের নভেম্বরে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ছাড়লাম। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আইন অমান্য করে সহযোগী সংগঠনের অনেককে আওয়ামী লীগে পদ-পদবী দেয়া হলো, কিন্তু আমার স্থান আর জেলা কমিটিতে হলো না। তাহলে কি সবার জন্য এক নিয়ম, আর আমার জন্য আরেক নিয়ম!’

সর্বশেষ তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো আওয়ামী লীগ ছেড়েছি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করি এবং করবো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত।’

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *