১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বার্তাটি লিখেছেন: Shuddho Barta

আমার সম্পর্কে : This author may not interusted to share anything with others
প্রচ্ছদ বিভাগ যুবদের কথা

জলে গিয়েছিলাম সই

সুমনকুমার দাশ: দিনমান ছোটাছুটিতে শরীরে একরাশ ক্লান্তি ভর করছে। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছিল। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। ঘুমজড়ানো চোখে টিভির সুইচ অফ করে ঘুমোতে যাব। ঠিক তখনই গানটির কথাগুলো ভেসে কানে আসে ‘জলে গিয়েছিলাম সই’। নিমিষেই ঘুম উধাও। ভারতীয় একটি বাংলা টিভি চ্যানেলের ধারাবাহিক নাটকে নায়কের বিয়ের অনুষ্ঠানে গানটি গীত হচ্ছিল।

এই গানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে একজন অশীতিপর বৃদ্ধার মুখমণ্ডল ভেসে উঠল। যিনি বেশ কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন। মারা যাওয়ার আগে বয়স হয়েছিল তিরাশি, অথচ তখনও তাঁর কী ভরাট কণ্ঠ ছিল। তাঁর কণ্ঠে এই গানটি আমি একাধিকবার শুনেছি। আহা, কী টান! কী আবেগ! তিনি হচ্ছেন চন্দ্রাবতী রায়বর্মণ। সিলেটের এই লোকসংগীত শিল্পী রাধারমণের অসংখ্য গান আমৃত্যু গেয়েছেন। চন্দ্রাবতী সম্পর্কে কলকাতার প্রখ্যাত শিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের মন্তব্য: ‘তাঁর কণ্ঠে রাধারমণের গানগুলো শুনলেই মনে এক ধরনের শীতল পরশ বয়ে যায়। জল-মাটি সংলগ্ন গানগুলো তাঁর গলায় নিপুণভাবে মানিয়ে গেছে। আমি যতবার সিলেটে এসেছি ততবারই মাসিমার কণ্ঠের গান রেকর্ড করেছি।’

রাধারমণের ধামাইল, কীর্তন, দেহতত্ত্ব, রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী থেকে শুরু করে বাউলাঙ্গিকের অধিকাংশ গানই চন্দ্রাবতী রায়বর্মণের ঠোঁটস্থ ছিল। কয়েক বছর আগে, একটি ঘরোয়া গানের আসরে তিনি গান গাইতে হাজির হয়েছিলেন। সেদিন তিনি রাধারমণের ধামাইল পর্যায়ভুক্ত বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন। খালি গলায় গান গাইছিলেন এবং ডান হাত ও পা দিয়ে মেঝেতে ঠুকিয়ে তাল তৈরি করছিলেন। তিনি একটার পর একটা গান গেয়েই চলছেন :        

সুরধনীর কিনারায় কি হেরিলাম নাগরী গো, সুন্দর গৌরাঙ্গ রায়।
সুন্দর কপালে সুন্দর তিলক সুন্দর নামাবলী গায় ॥
সুন্দর নয়নে চাহে যার পানে
দেহ হইতে প্রাণটি লইয়া যায় ॥

যখন গৌরায় গান করে নৈদাবাসীর ঘরে ঘরে
গৌরা প্রেমবশে রাধার গুণ গায় ॥

না জানি কোন রসে ভাসে, একবার কান্দে একবার হাসে
পূর্ণশশী উদয় নদীয়ায় ॥

ভাইবে রাধারমণ বলে একবার আইনে দেখাও তারে
আমি জন্মের মতো বিকাই রাঙা পায় ॥

যতদূর মনে পড়ে সেদিন চন্দ্রাবতী রায়বর্মণ ছয় থেকে সাতটি গান গেয়েছিলেন। তবে সেই গানটির কথা বেশ মনে আছে : ‘রস ছাড়া রসিক মিলে না, জল ছাড়া মীনের জীবের মরণ’। পুরো গানটা স্পষ্ট মনে পড়ছে না। একটি সংকলন খুলে গানটি বের করলাম:

রস ছাড়া রসিক মিলে না, জল ছাড়া মীনের জীবের মরণ
রসিক চাইয়া ডুবল রাধার মন।
সখি গো যে ঘাটে জল ভরতে গেলাম সে ঘাটে ইংরেজের কল
এগো কলসির মুখে ঢাকনি দিয়ে সন্ধানে ভরিব জল ॥
সখি গো, দলে দলে অষ্টদলে শত দলে বৃন্দাবন
এগো কোন ফুলেতে ব্রহ্মাবিষ্ণু প্রেমের গুরু মহাজন
এগো দস্তা পিতল একই রকম মিশে না গো কি কারণ
এগো সোনায় সোহাগা মিশে মন মিশে না কি কারণ
রসিক চাইয়া ডুবল রাধারমণ ॥

কিন্তু চন্দ্রাবতী রায়বর্মণ গানটি ঠিক এভাবে গেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না। ঠিক কোথায় হেরফের রয়েছে সেটা মনে পড়ছে না, তবে উদ্ধৃত গানটির মতো তিনি যে গাননি সেটা বেশ মনে আছে। কথা প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সুনামগঞ্জের আরেক প্রখ্যাত বাউল গীতিকার শাহ আবদুল করিমের উক্তি। তিনি টি এম আহমেদ কায়সারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চৌধুরী গোলাম আকবর সম্পাদিত রাধারমণের গানের একটি সংকলন প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন:

বেশ কিছুদিন পূর্বে রাধারমণের একটা গানের বই বেরিয়েছিল মদনমোহন কলেজ থেকে গোলাম আকবর সাহেবের সম্পাদনায়। রাধারমণকে একেবারে জীবন্ত কাষ্ঠ করা হয়েছে বইটার পাতায় পাতায়। গানের কলির ঠিক নেই; শব্দ-বিভ্রান্তি, পদ-ভ্রান্তি, একেবারে যাচ্ছেতাই কা-! মনটা দমে গেল এটা দেখে। রাধারমণের গান তো এই ক্ষীণ স্মৃতিশক্তি নিয়েও আজো ভুলতে পারিনি। এই ভাগ্য যদি রাধারমণের ক্ষেত্রে ঘটে, আমি তো কোন ছার!

আসলে এই যে পদ-ভ্রান্তি কিংবা গানের কলির হেরফের সেটা নানা কারণে হচ্ছে। যেহেতু রাধারমণের গানের কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছিল না। তাই এসব গান অনেক সময় লোকমুখে প্রচলিত হয়েছে। প্রায় ক্ষেত্রে গ্রামের সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মহিলারা ধামাইল কিংবা বৈঠকি গান গাওয়ার জন্য খাতায় টুকে রাখছেন। আবার এসব গান অনুলিখিত হয়ে এক খাতা থেকে অন্য খাতায় যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রায়সময় পদচ্যুতিও ঘটছে। ফলে ওইসব মহিলাদের কাছ থেকে সংগৃহীত গানগুলোর আসল পদ নিয়ে বিতর্ক রয়েই যাচ্ছে। তাই, এ ধরনের গান সংকলনভুক্ত করার সময় অবশ্যই যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

একদিন এ বিষয়টির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ধামাইল গানের আরেক কিংবদন্তি-তুল্য গীতিকার প্রয়াত প্রতাপরঞ্জন তালুকদার আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার অনেক গান রাধারমণের নামে, আবার রাধারমণের অনেক গান আমার নামপদ ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলে এখনও মহিলারা গেয়ে থাকেন।’ প্রতাপরঞ্জনের কথা শুনে চমকে উঠি, এটি তো আরও বিপজ্জনক।

এমনটি কেন হচ্ছে- এ প্রশ্নের জবাবে প্রতাপরঞ্জন বলেছিলেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন গ্রামে গেলে পরিচিত মহিলারা গান লিখে দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ জানান। তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের খাতায় গানও লিখে দিয়েছি। সেক্ষেত্রে ধামাইল গানের আসরে ওই গান গাওয়ার সুবাদে মুখে মুখে এইসব গান বিভিন্ন মহিলাদের কাছে ছড়িয়ে পড়ছে। তখন এক মহাজনের নাম ভুল করে অন্য মহাজনের নামে মহিলারা গেয়ে ফেলছেন। যেহেতু রাধারমণ এবং আমার গানই আসরে বেশি গাওয়া হয়, তাই আমাদের মধ্যেই নামপদ নিয়ে ওই ভুলটুকু বেশি হয়।’

একই প্রসঙ্গে ‘বাউলকবি রাধারমণ গীতিসংগ্রহ’-এর সংকলক বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী তাঁর সংগৃহীত গান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সংগৃহীত গীতিসমূহের সবগুলোর ভাষা ও ছন্দ সবসময় অবিকৃত থাকেনি, বিশেষত আমাদের মৌলিক সংগ্রহ যখন অনুলিখিত বা তস্য অনুলিখিত খাতা কিংবা পরম্পরাধৃত লোককণ্ঠ থেকে আহৃত। তবু লেখকের ছন্দের প্রতি মনোযোগ যথারীতি নিবিষ্ট ছিল তা খুব সহজেই উপলব্ধ হয়, কেননা আমরা যেসব গীতি পরম্পরাগত সূত্র থেকে পেয়েছি তাতেও ছন্দ পরিকল্পনার আঁচ স্পষ্ট।’  

এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক। সেদিন গানের আসরে সিলেটের সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় বাউল গায়ক আবদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তিনিও রাধারমণের বাউলাঙ্গিকের বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন। আমরা আসরের শ্রোতারা বিমুগ্ধ হয়ে গান শুনছিলাম। শিল্পীরা গান গাইছিলেন আর গানের তাৎপর্যগত দিকগুলো তুলে ধরছিলেন। সন্ধ্যার দিকে আসর শেষ হয়।

রাতে বাড়ি ফেরার পরও আসরের রেশ থেকে যায়। গত কয়েক বছর ধরে সিলেটের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ঘুরে পল্লি-মহিলাদের কাছ থেকে তাঁদের গানের অনেকগুলো খাতা সংগ্রহ করেছিলাম। সেসব খাতা বের করে রাধারমণের গানগুলো আলাদা করতে থাকি। একসময় দেখি এসব খাতায় প্রায় দুইশ রাধারমণের গান রয়েছে। সে গানগুলো যাচাই-বাছাই করে মাস তিনেকের প্রচেষ্টায় গোটা চল্লিশেক গান অগ্রন্থিত অবস্থায় আবিষ্কার করি। সেসব গানের মধ্য থেকে ৩০টি গান নিয়ে গল্পকার রাখাল রাহার আগ্রহে ‘অগ্রন্থিত রাধারমণ’ নামে একটি গানের সংকলনের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করি। সেটা সম্প্রতি প্রকাশিতও হয়েছে।

বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরিকালীন রাধারমণকে নিয়ে বেশ কয়েকটি সংকলন ও বিক্ষিপ্ত কিছু লেখা পড়ে রাধারমণের প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়। কিন্তু আফসোসও হয়- আজ পর্যন্ত রাধারমণকে নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো কাজও হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে মোস্তাক আহমাদ দীনের ভাষ্য প্রণিধানযোগ্য :

ভাবুক ও রসরাজ হিসেবে রাধারমণের স্থান যে-শিখরে, তাতে, এ-পর্যন্ত তিনি যতটা মূল্যায়িত তা একদমই সামান্য, তবে আশার কথা, তাঁর গানের নানাবিধ সংকলন প্রকাশের পর থেকে গানের ভাবব্যঞ্জনার দিকে এখনকার রসিক-গবেষকের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। এই আগ্রহীদের বেশির ভাগই রাধারমণের পদ-অন্তরিত বৈষ্ণব-রসের দিকটাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যগ্র। এমন নয় যে তার পদে সেই রস নেই, বরং আমাদের অজানা নয়, তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন বৈষ্ণব রঘুনাথের কাছে, নলুয়ার হাওরসংলগ্ন আশ্রম স্থাপনের ব্যাপারটিও তো তারই প্রমাণবহ। আমাদের অনুযোগ/আপত্তি সেই জায়গায় যেখানে আলোচকেরা তাঁদের লক্ষ্য মূর্ত করতে গিয়ে পদকারকে তাঁর সত্তার মানব-অনুভূতিগত দিক থেকে খারিজ করে দিতে চান, এবং তা কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে আলোচক, পদকারকে তত্ত্বলীন করে দিয়ে তাঁকে অতিমানবের স্তরে নিয়ে যেতেও এতটুকু কুণ্ঠিত নন। তাঁরা ভাবেন, প্রেমপ্রকাশের এই যা কিছু- সে রাধাই হোক বা কৃষ্ণ; সবসময়ই রূপক। আর গোলটাও বাঁধে সেখানে। অথচ তাঁদের অজানা থাকবার কথা নয় সৌন্দর্য বা সত্য যাই হোক তার মর্মে পৌঁছাতে হলে, বাস্তব-রূপক-উপমান-উপমেয়সহ একযোগে না গেলে সে-যাত্রা পূর্ণ হয় না, পূর্ণ হওয়ারও নয়, কারণ, রূপকে তো ছড়িয়ে থাকে পদকারের জীবনাভিজ্ঞতারই চিহ্ন। ফলে, তাকে ছাড়া মূল্যাঙ্কনটা যে একমুখী হয়ে পড়বে এ আর আশ্চর্য কী।

এ বক্তব্যের আলোকেই আরেকটি বিষয়ের উল্লেখ আবশ্যক- ইদানীং কিছু কিছু আলোচকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, রাধারমণ বাউল নাকি বৈষ্ণব কবি, এ নিয়ে একটা তুচ্ছ বিতর্ক চলে আসছে। প্রত্যেকেই নিজেদের যুক্তিকে অকাট্য করে তুলতে নানা ধরনের যুক্তি-তর্কে মেতে উঠছে। ‘রাধারমণের গান’ নামে একটি সংকলন সম্পাদনা করার সূত্রে তপন বাগচী অভিমত দিয়েছিলেন, রাধারমণ নিজেই যখন তাঁর বিভিন্ন গানে ‘বাউল’ পরিচয় দিয়েছেন, তখন আমাদের মেনে নিতে আপত্তি থাকে না। তবে একথা ঠিক যে, তাঁর গানে ও সুরে বৈষ্ণব ভাবধারা বেশি প্রকটিত।

এ বিষয়ে সবিনয়ে শুধু এটুকু বলতে চাই, রাধারমণের ধামাইল গানের পাশাপাশি বাউলাঙ্গিকের অসংখ্য গান যেমন রয়েছে, তেমনি বৈষ্ণব ভাবধারার গানও রয়েছে। ফলে তাঁকে যেমন একজন বাউল গীতিকার হিসেবে বলা যায়, তেমনই বৈষ্ণব ভাবধারার গীতিকার হিসেবেও মেনে নিতে তো কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘[…] ভাব ও কথাংশের প্রাকৃত আকর্ষণের জোরেই বিগত শতাব্দীকাল থেকে এই গীতিমালা গোষ্ঠীধর্মানুগত থেকেও উত্তর-পূর্ব বাংলা তথা ভারতের পল্লির হিন্দু মুসলমান সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করে এসেছে।’

রাধারমণের গানের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মোস্তাক আহমাদ দীন বলেছিলেন, ‘রাধারমণ প্রান্তপাড়ার অধিবাসী। যেখানে বিদ্যাসাগরের সমাজ ও শিক্ষা-সংস্কারের প্রভাব গিয়ে পৌঁছয় না সেখানে একজন লোকায়ত রাধারমণের গান ঠিকই পৌঁছে যায়, কারণ রাধারমণ দেহ-মনে সেই প্রান্তের বাসিন্দা, তাঁর ভাষাও সেখানকার নানারকম বিভঙ্গ ধারণ করতে সক্ষম। তত্ত্বের আবরণ থাকলেও তাঁর গান এমনভাবে সেখানকার বিষয় ধারণ করে, যে-কারও মনে হতে পারে তিনি অন্যের, বিশেষ করে রাধা/নারীভাব; বাস্তব অর্থে তিনি নিজেও বুঝি যাপন করে চলেন। তাই তাঁর গানে রাধাকে দেখা যায় কখনও বিদ্রোহী, কখনও বিরহী, আবার কখনও অতিশয় সমর্পিতপ্রাণা।’

মোস্তাক আহমাদ দীন তাঁর লেখায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ সিলেট অঞ্চলে বহুল প্রচলিত রাধারমণের একটি গান উদ্ধৃত করেছেন, যেটি এ পর্যন্ত কোনো সংকলনভুক্ত হয়নি। গানটি এ-রকম :

আমায় নারীকুলে জন্ম কেন দিলায় রে দারুণ বিধি
নারীকুলে জন্ম দিয়া ঘটাইলায় দুর্গতি রে ॥

শিশুকালে পিতার অধীন, যৌবনেতে স্বামীর অধীন রে
ওরে বৃদ্ধাকালে পুত্রের অধীন আমারে বানাইলায় রে ॥

যদি আমি পুরুষ হইতাম মোহন বাঁশি বাজাইতাম রে
কত নারীর মন ভুলাইতাম বাজাইয়া মুরলী রে ॥

ভাইবে রাধারমণ বলে নারীজনম যায় বিফলে রে
না লাগিল সাধের জনম বন্ধুয়ার সেবায় রে ॥

লেখক স্বপন নাথ ‘যমুনা উজান বহে শ্যামের বাঁশির সনে’ শিরোনামে এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘কেবল রাধারমণ দত্ত নয়, সকল লোককবি বা বাউলের একটি সাধারণ বিষয় হলো আত্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা। উল্লেখযোগ্য যে, এই আত্মজিজ্ঞাসা বা আত্মমুক্তির সাধনা প্রাচীনকাল থেকেই শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল ব্যক্তির মধ্যেই লক্ষণীয়। […] রাধারমণ ভক্ত সাধক হলেও আত্মজিজ্ঞাসায় জারিত হয়ে মুক্তির সন্ধান করেছেন মুক্তপ্রাণে। তিনি গুরুবাদী ধারায় বিশ্বাসী হলেও সংস্কারাচ্ছন্ন বা অন্ধ ছিলেন না।’

রাধারমণ গবেষক নন্দলাল শর্মা কয়েক বছর আগে আমাকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘রাধারমণের অনেক গান এখনও সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করা দরকার। অনেক প্রবীণ মানুষ এখনও জীবিত রয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে গানগুলো শ্রুতিলিখন করে রাখা উচিত। নইলে ওদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গানগুলোও চিরতরে হারিয়ে যাবে।’

নন্দলাল শর্মার আক্ষেপ যে আমার নিজের সঙ্গে এমনভাবে মিলে যাবে সেটা তো কখনো ভাবিনি। আমি চোখ বুজি। ফিরে যাই শৈশবের সেই প্রাতঃভ্রমণের দিনগুলোতে। দাদুর কনিষ্ঠা আঙুলে ধরে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে সরু কাঁচা রাস্তা ধরে আমরা দাড়াইন নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটতাম। ঘণ্টাখানেক এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে মাইল দেড়েক দূরের যাত্রাপুর গ্রামের পাশে চলে যেতাম। আবার একই ভাবে ফিরে আসতাম। এ সময়টাতে দাদু অনেক গল্প আর কীর্তন ঢঙয়ের গান শোনাতেন।

আমার দাদু ব্রজেন্দ্র চৌধুরি রাধারমণের অনেক বৈঠকি ও কীর্তন গান জানতেন। প্রাতঃভ্রমণের সময় দাদু একটা গান খুব বেশি গাইতেন : ‘মুখে আমার কৃষ্ণ নাম গো, অন্তরে নাই মধু’। দাদু আজ বেঁচে নেই, প্রায় পঁচিশ বছর আগে মারা গেছেন। তিনি মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই গানটিও যেন চিরতরে হারিয়ে গেছে। কীর্তন-ঢঙের এই বৈঠকি গানটির কোনো হদিস পরবর্তীকালে আমি আর পাইনি। আবছা আবছা যতটুকু মনে পড়ে, দাদু বলেছিলেন- এটি রাধারমণের লেখা বৈঠকি গান। এখন, এই মুহূর্তে রাধারমণের একটি গান হারিয়ে যাওয়ার বেদনা আমাকে খুব তাড়া করছে।

  • সুমনকুমার দাশ : লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

Leave a comment